যে সমাজে কন্যা সন্তানের জন্মে “লক্ষ্মী এসেছে” বলা হয়, সেই সমাজেই আজ মেয়েরা সবচেয়ে বেশি অনিরাপত্তায় ভুগছে—এ এক নির্মম বৈপরীত্য। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধ—সবই নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার কথা বলে। বিশেষ করে ইসলাম নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা যেন সেই শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
আজ একটি মেয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে শুধু একবার নয়, অসংখ্যবার ভাবে—সে কি নিরাপদ? এই প্রশ্নের জবাব কি আমরা কেউ দিতে পারি? রাষ্ট্র, সমাজ, আইন—কেউ কি তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, এই সহিংসতার শিকার হচ্ছে ছোট ছোট শিশুরাও। যারা পৃথিবীটা ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে ঝরে পড়ছে। নাম বদলায়—আসিয়া, রামিসা, কিংবা অন্য কেউ—কিন্তু কষ্টের গল্প একই থাকে। প্রতিবারই আমরা শোকাহত হই, ক্ষোভে ফেটে পড়ি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু কিছুদিন পরই সবকিছু থেমে যায়। নীরবতা নেমে আসে, আর সেই নীরবতার সুযোগেই অপরাধীরা আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দেশে কি ধর্ষণের বিচার সত্যিই নিশ্চিত? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অপরাধী ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, কিংবা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার পায় না ন্যায়বিচার। তারা পায় শুধু একটি কবর, আর সারাজীবনের কান্না।
যে দেশে ৫ বছরের একটি শিশু স্কুলব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসে না, যে দেশে মেয়েরা নিজেদের ঘরেও নিরাপদ নয়—সেখানে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ব্যর্থতা স্পষ্ট।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি নতুন নয়। অনেকেই মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুলছেন, যেন এটি অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে—শুধু শাস্তির কঠোরতা নয়, শাস্তির নিশ্চয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত, এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ—এসব নিশ্চিত না হলে কোনো শাস্তিই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না।
একইসঙ্গে সমাজের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন—সব জায়গা থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে মানুষের ক্ষোভ বাড়বে, আস্থাহীনতা গভীর হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান কোনো সমাধান নয়; বরং তা নতুন বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে আইনের মধ্য দিয়েই।
আজ আর চুপ থাকার সময় নয়।
কারণ আজকের নীরবতা, আগামীকালের আরেকটি ট্র্যাজেডির পথ তৈরি করে।
প্রশ্নটা রয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই, নাকি শুধু কিছুদিনের জন্য ক্ষোভ দেখিয়ে আবার সব ভুলে যেতে চাই?
আলিশা আহাদ
শিক্ষার্থী, নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়