কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লা নগরীতে সিনিয়র সাংবাদিক ও পেশাজীবী মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র ও তাঁর পরিবার একটি সুসংগঠিত অপরাধ চক্রের ধারাবাহিক হামলা, চক্রান্ত ও নানামুখী অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই হয়রানি ও আক্রমণের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। একের পর এক আমলযোগ্য অপরাধ করে চক্রটি এখনও লাগামহীন রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ভাষ্যমতে, পেশাগত দায়িত্ব পালন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর পেছনে লেগে রয়েছে। ২০১৭ সালের ৩ মে থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি দফায় দফায় থানায় জিডি ও মামলা করেছেন।
অভিযোগে জানা যায়, অধিকাংশ সময় এই চক্রের সদস্যরা মুখাবয়বে মাস্ক এবং মাথায় লাল-কালো রঙের হেলমেট পরে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে এসে তাঁর গতিরোধ করে হামলা চালায়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসম্বলিত ডিভাইস এবং নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে সাংবাদিক শুভ্র বিজ্ঞ আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন রয়েছে: ১. জিআর ৮৫০ মামলা (এফআইআর নং-৪১, ১৪ নভেম্বর ২০২৪): দণ্ডবিধি আইনের ১৪৩/৩৪২/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৪২৭/৩৮৫/৫০৬ (৩)/৩৪ ধারায় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়েরকৃত এই মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারে বিজ্ঞ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
২. দস্যুতা সংক্রান্ত জিআর ৮১২ মামলা (এফআইআর নং-৫১, ১৬ অক্টোবর ২০২৫): দণ্ডবিধি আইনের ৩৯২/৩৪ ধারায় চলমান এই মামলায় ইতোমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও চক্রের মূল হোতারা এখনও অধরা। উল্টো মামলা প্রত্যাহারের জন্য অজ্ঞাত নম্বর থেকে প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
৩. সর্বশেষ সিআর মামলা (নং-৬১৫/২৬, ১৬ জুন ২০২৬): ভুয়া প্রশাসনিক পরিচয় (মাসুদ প্রিন্স গং) ও হ্যান্ডকাফ ব্যবহার করে অপহরণের চেষ্টা, চাঁদা দাবি ও মারধরের অভিযোগে দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩৮৫/৩৬৫/৪২০/৫১১/৫০০/৩৭৯/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১ এ মামলাটি করা হয়। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি রেকর্ডভুক্ত করে কোতোয়ালি থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
শুধু শারীরিক হামলাই নয়, এই চক্রটি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিক শুভ্রর মোবাইল নম্বর হ্যাকিং ও ক্লোনিং এর মাধ্যমে সব কথোপকথনে আড়ি পাতছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বেনামী ও ভুয়া ফেসবুক পেজ এবং মেসেঞ্জার আইডি থেকে তাঁর বিকৃত ছবি এবং মৃত্যুর ইঙ্গিতবাহী 'কাফনে মোড়ানো' প্রতীকী ছবি আপলোড করে সামাজিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।
চক্রের লাগাম টানতে এবং জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সর্বশেষ গত ৭ জুন ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক এবং ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিকার ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে স্মারকলিপি জমা দেন মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র। এর আগে গত ১৪ ও ১৯ জুন কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ (এসডিআর নং-৪৮৫৩) এবং অনলাইন জিডি (নং-১৩৫৭) করা হয়।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এর অনুলিপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ডিজিএফআই, এনএসআই, জেলা পিপি, সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জেলা আইনজীবী সমিতি এবং কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও ‘মানবাধিকার খবর’-এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন। তিনি বলেন, "একজন গণমাধ্যমকর্মী যদি বারবার আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও বছরের পর বছর সপরিবারে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সুসংগঠিত চক্রের পেছনে কারা রয়েছে তা তদন্ত করে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।"
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ভুক্তভোগী সাংবাদিকের দায়ের করা মামলা ও জিডিগুলোর বিষয়ে পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত চলছে। আসামিরা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করায় তাদের ধরতে কিছুটা সময় লাগছে, তবে খুব দ্রুতই পুরো চক্রটিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে, একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানে স্বাধীন গণমাধ্যম ও আইনের শাসনের ওপর আঘাত। কুমিল্লার সচেতন মহল অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।